এসএসসি জীববিজ্ঞান তৃতীয় অধ্যায় (কোষ বিভাজন)

3_pro_metaphase

প্রতিটি জীবদেহ কোষ দিয়ে গঠিত । একটি মাত্র কোষ দিয়ে প্রতিটি জীবন শুরু হয় । প্রকৃতপক্ষে এ কোষটিও উৎপত্তি হয় আগের কোন কোষ থেকেই। বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যাবৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কোনো কোনো জীবের দেহ একটি মাত্র কোষ দিয়ে গঠিত। এদের বলা হয় এককোষী (unicellular) জীব, যেমন ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ সবুজ শৈবাল, অ্যামিবা, প্লাজমোভিয়াম প্রভৃতি।

চিত্রঃ অ্যামিবা, নীলাভ সবুজ শৈবাল, ব্যাকটেরিয়া

ekkose

 

এসব জীব বিভাজনের মাধ্যমেই একটি কোষ থেকে অসংখ্য এককোষী জীবে পরিণত হয়। আবার অনেক জীব একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত। এদের বলা হয় বহুকোষী (multicellular) জীব। মানুষ, আম গাছ, বট গাছ ইত্যাদি জীব কোটি কোটি কোষ দিয়ে গঠিত।

চিত্রঃ বট গাছ, আম গাছ

tree

 

বিশালদেহি একটি বটগাছের সূচনাও ঘটে একটি মাত্র কোষ (জাইগোট বা নিষিক্ত ডিম্বক) থেকে। এককোষী নিষিক্ত ডিম্বক থেকে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় একসময় কোটি কোটি কোষের একটি পরিণত মানুষের সৃষ্টি হয়। আবার কোষ বিভাজনের মাধ্যমেই পুং ও স্ত্রী গ্যামেট সৃষ্টি হয়ে নতুন প্রজন্মের জন্ম হয়। জীবের বৃদ্ধি ও প্রজননের উদ্দেশ্যে কোষ বিভাজনের (cell division) মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে থাকে।

কোষ বিভাজনের প্রকারভেদ (Types of cell division)

জীবদেহে তিন প্রকার কোষবিভাজন দেখা যায়, যথা-

১। অ্যামাইটোসিস (Amitosis)
২। মাইটোসিস (Mitosis)
৩। মিয়োসিস (Meiosis)

অ্যামাইটোসিস

এই বিভাজন প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াসটি প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি দুটি অংশে ভাগ হয়। বিভাজনের শুরুতে নিউক্লিয়াসটি ধীরে ধীরে লম্বা হতে থাকে এবং পরে দুইপ্রান্তে মোটা ও মাঝের অংশটি সুরু হতে থাকে। মাঝের সরু অংশটি ক্রমশ আরও সরু হয়ে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং দুটি অপত্য (daughter) নিউক্লিয়াসের সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে কোষপ্রাচীরটির মধ্যভাগ ভিতরের দিকে প্রবেশ করে সাইটোপ্লাজমকেও দুইভাগে বিভক্ত করে ফেলে এবং দুটি অপত্য কোষের (daughter cell) সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ সবুজ শৈবাল, ঈস্ট প্রভৃতি জীবকোষে এ ধরনের কোষ বিভাজন ঘটে।

ভিডিওঃ অ্যামাইটোসিস কোষবিভাজন

 

 

প্রোফেজ (Prophase)

এটি মাইটোসিসের প্রথম পর্যায়। এ পর্যায়ে কোষের নিউক্লিয়াস বড় হয় এবং ক্রোমোজোম থেকে পানি হ্রাস পেতে থাকে। ফলে ক্রোমোজোমগুলো ক্রমান্বয়ে সংকূচিত হয়ে মোটা ও খাটো হতে শুরু করে। তখন যৌগিক অণুবীক্ষণযন্ত্রে এদের দেখা সম্বব হয়। এ পর্যায়ে প্রতিটি ক্রোমোজোম সেন্ট্রোমিয়ার ব্যতীত লম্বালম্বি দুভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি ক্রোমাটিড উৎপন্ন করে। ক্রোমোজোমগুলো কুন্ডলিত অবস্থায় থাকাতে সংখ্যা গণনা করা যায় না।

1_porphase

প্রো-মেটাফেজ (Pro-Metaphase)

এ পর্যায়ে একেবারে প্রথমদিকে উদ্ভিদকোষে কতকগুলো তন্তুময় প্রোটিনের সমন্বয়ে দুইমেরু বিশিষ্ট স্পিন্ডল যন্ত্রের (spindle apparatus) সৃষ্টি হয়। স্পিন্ডল যন্ত্রের দুই মেরুর মধ্যবর্তী স্থানকে ইকুয়েটর বা বিষুবীয় অঞ্চল বলা হয়। স্পিন্ডলযন্ত্রের তন্তুগুলো এক মেরু থেকে অপর মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত। এদেরকে স্পিন্ডল তন্তু (spindle fibre) বলা হয়। এ পর্যায়ে ক্রোমোজোমের সেনট্রমিয়ার স্পিন্ডললযন্ত্রের কতিপয় নির্দিষ্ট তন্তুর সাথে সংযুক্ত হয়। এই তন্তুগুলোকে আকর্ষণ তন্তু (traction fibre) বলা হয় । ক্রোমোজোমের সাথে এই তন্তুগুলি সংযুক্ত বলে এদের ক্রোমোজোমাল তন্তুও বলা হয়। ক্রোমোজোমগুলো এ সময়ে বিষুবীয় অঞ্চলে বিন্যস্ত হতে থাকে। কোষের নিউক্লিয়াসের নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাসের বিলুপ্তি ঘটতে থাকে। প্রাণিকোষে স্পিন্ডল যন্ত্র সৃষ্টি ছাড়াও পূর্বে বিভক্ত সেন্ট্রিওল দুটি দুই মেরুতে অবস্থান করে এবং সেন্ট্রিওল দুটির চারিদিকে থেকে রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। একে অ্যাস্টার-রে বলে।

 

3_pro_metaphase

 

মেটাফেজ (Metaphase):

এ পর্যাযের প্রথমেই সব ক্রোমোজোম স্পিন্ডল যন্ত্রের বিষুবীয় অঞ্চলে (দুই মেরুর মধ্যখানে) অবস্থান করে। প্রতিটি ক্রোমেজোমের সেন্ট্রোমিয়ার বিষুবীয় অঞ্চলে এবং বাহু দুটি মেরুমুখী হয়ে অবস্থান করে। এ পর্যায়ে ক্রোমোজোমগুলো সর্বাধিক মোটা ও খাটো হয়। প্রতিটি ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিড দুটির আকর্ষণ কমে যায় এবং বিকর্ষণ শুরু হয়। এ পর্যাযের শেষ দিকে সেন্ট্রোমিয়ারের বিভাজন শুরু হয়। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন ও নিউক্লিওলাসের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটে।

 

ভিডিওঃ মেটাফেজ

 

 

অ্যানাফেজ (Anaphase):

প্রতিটি ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার দুভাগে বিভক্ত হযে যায়, ফলে ক্রোমোটিড দুটি আলাদা হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় প্রতিটি ক্রোমোটিডকে অপত্য ক্রোমোজোম বলে এবং এতে একটি করে সেন্ট্রোমিয়ার থাকে। অপত্য ক্রোমোজোমগুলোর মধ্যে বিকর্ষণ শক্তি বৃদ্ধি পায়, ফলে এরা বিষুবীয় অঞ্চল থেকে পরস্পর বিপরীত মেরুর দিকে সরে যেতে থাকে। অর্থাৎ ক্রোমোজোমগুলোর অর্ধেক এক মেরুর মেরুর দিকে এবং বাকি অর্ধেক অন্য মেরুর দিকে এবং বাকি অর্ধেক অন্য মেরুর অগ্রসর হতে থাকে। অপত্য ক্রোমোজোমের মেরু অভিমুখী চলনে সেন্ট্রোমিয়ার অগ্রগামী থাকে এবং বাহুদ্বয় অনুগামী হয়। সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থান অনুযায়ী ক্রোমোজোমগুলি V,L ,J বা I এব মতো আকার ধারণ করে। এদেরকে যথাক্রমে মেটাসেন্ট্রিক, সাবমেটাসেন্ট্রিক, অ্যাক্রোসেন্ট্রিক বা টেলোসেন্ট্রিক বলে। অ্যানাফেজ পর্যায়ের শেষের দিকে অপত্য ক্রোমোজোমগুলো স্পিন্ডলযন্ত্রের অবস্থান নেয় এবং ক্রোমোজোমের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

ভিডিওঃ অ্যানাফেজ

টেলোফেজ (Telophase):

এটি মাইটোসিসের শেষ পর্যায়। এখানে প্রোফেজ এর ঘটনাগুলো পর্যায়েক্রমে বিপরতিভাবে ঘটে। ক্রোমোজোমগুলোতে পানি যোজন ঘটতে থাকে এবং সরু ও লম্বা আকার ধারণ করে। অবশেষে এরা জড়িয়ে গিয়ে নিউক্লিয়ার রেটিকুলাম গঠন করে। নিউক্লিওলাসের পুনঃআবির্ভাব ঘটে। নিউক্লিয়ার রেটিকুলামকে ঘিরে পুনরায় নিউক্লিয়ার মেমব্রেনের সৃষ্টি হয়, ফলে দুই মেরুতে দুটি অপত্য নিউক্লিয়াস গঠিত হয়। স্পিন্ডলযন্ত্রের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে এবং তন্তুগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

টেলোফেজ পর্যায়ের শেষে বিষূবীয় তলে এন্ডোপ্লাজমিক জালিকার ক্ষুদ্র অংশগুলো জমা হয় এবং পরে এরা মিলিত হয়ে কোষ প্লেট গঠন করে। সাইটোপ্লাজমিক অঙ্গানুসমূহের সমবন্টন ঘটে। ফলে দু’টি অপত্য কোষ (daughter cell) সৃষ্টি হয়। প্রাণীর ক্ষেত্রে স্পিন্ডলযন্ত্রের বিষূবীয় অঞ্চল বরাবর সোখ ঝিল্লিীট গর্তের ন্যায় ভিতরের দিকে ঢুকে যায় এবং এ গর্ত সবদিক থেকে ক্রমান্বয়ে গভীরতর হয়ে একত্রে মিলিত হয়, ফলে কোষটি দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে।

5_anaphase

 

এক নজরে মাইটোসিসের পর্যায়সমূহ

মাইটোসিস কোষবিভাজন একটি অবিচ্ছিন্ন বা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই বিভাজনে প্রথমে ক্যারিওকাইনেসিস অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটে এবং পরবর্তীতে সাইটোকাইনেসিস অর্থাৎ সাইটোপ্লাজমের বিভাজন ঘটে। বিভাজন শুরুর পূর্বে কোষের নিউক্লিয়াসে কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ হয়। এ অবস্থাকে ইন্টারফেজ পর্যায় বলে। বর্ণনার সুবিধার জন্য মাইটোসিস প্রক্রিয়াকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে।

 

ভিডিওঃ মাইটোসিসের পর্যায়সমূহ

 

 

(Photo source: https://goo.gl/esLp78)

সঠিক উত্তরে টিক (√) চিহ্ন দাও।

প্রোফেজ মাইটোসিসের প্রথম পর্যায়।
জীবদেহে চার প্রকার কোষবিভাজন দেখা যায়।
বট গাছ এককোষী (unicellular) জীব।
অ্যমাইটোসিস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কোষের নিউক্লিয়াসটি প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি দুটি অংশে ভাগ হয়।