ছেলে আর মেয়েদের খেলনা

মার্ক জুকারবার্গ সম্বন্ধে আমরা জানবো
April 30, 2017
ছেলে আর মেয়েদের বড় হয়ে ওঠার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য
May 7, 2017
Show all

ছেলে আর মেয়েদের খেলনা

আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যত্। একদিন এই ছোট্ট শিশুরাই বড় হবে, হবে জাতির কর্ণধার। ফুলের নতুন কুঁড়ির মতোই কোমল এই শিশুদের মন। তারাও কল্পনা করতে পারে, দেখতে পারে স্বপ্নও। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন বা কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দায়িত্ব নিতে হয় শিশুর অভিভাবক বা মা-বাবাকেই। কারণ, শিশুরা বড় বেশি অনুকরণপ্রিয়। ছোটবেলা থেকে তাদের যে পরিবেশে যেভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, তারা সেভাবেই শিখতে শুরু করে। এভাবেই গড়ে ওঠে তাদের মানসিক বিকাশ।

কিন্তু আমাদের সমাজে দেখা যায়, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের লিঙ্গবৈষম্যের শিক্ষা দেওয়া হয়। শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে অভিভাবকেরা শিশুকে এই শিক্ষা দিয়ে থাকেন। আর এতে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনতে শুরু করে। বুঝতে শেখে ছেলে-মেয়ের পার্থক্য।

আমরা যখন শিশুদের জন্য খেলনা কিনতে দোকানে যাই তখন খেলনার দোকান থেকে আমরা সেইটিই বেছে নিই যেটি শিশুদের ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়েকে বিভাজন করবে ।

ছেলে শিশুর জন্য খেলনা গাড়ি, উড়োজাহাজ, ফুটবল জাতীয় খেলনার কথাই আমাদের মাথায় আসে এবং মেয়ে শিশুর জন্য পুতুল, হাঁড়িপাতিল জাতীয় খেলনা নির্বাচন করি ।

ওই ছেলে শিশুটির জন্য আমরা কিন্তু একটা পুতুলও কিনতে পারতাম। কিন্তু কিনলাম না। কেন? কারণ, পুতুল আমরা মেয়ে শিশুদেরই খেলনা হিসেবে দিয়ে থাকি বেশি। পুতুলকে মনে করা হয় মেয়ে শিশুদের খেলনা।

আমার এক বোনের মেয়েকে দেখতে গিয়ে খেয়াল করেছিলাম, শিশুটির জন্য আত্মীয়-স্বজনরা যতগুলো উপহার  এনেছিল, তার সবই ছিল পুতুল। ছিল না কোন গাড়ি, উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার, ফুটবল বা ফিশিং গেম জাতীয় খেলনা! এমনকি আমরা নিজেরাও ওই মেয়ে শিশুটির জন্য একটা পুতুলই নিয়ে গিয়েছিলাম!

আমি বলছি না যে, দুনিয়ার  সব শিশুর বেলায় এমনটিই ঘটছে, নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রমও ঘটছে কোথাও কোথাও।

আমাদের সমাজে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে যে, মেয়েরা জন্মগতভাবেই একটু নরম-শরম স্বভাবের হয় আর ছেলেরা হয়একটু ডানপিটে স্বভাবের। এমনকি, একটি ছেলে শিশু ও একটি মেয়ে শিশুর আচার আচরণ লক্ষ্য  করলেও এমন চিত্রই ফুটে ওঠে হয়তো।

অস্বীকার করছি না, ছেলে আর মেয়ে শিশুর মধ্যে দৃশ্যমান একটি পার্থক্য আছে, সেটি শুধুই শারীরিক। কিন্তু  মানুষের শরীর তো পরিচালিত হয় মস্তিষ্ক দ্বারা। আর এই মস্তিষ্কে শিশুকালেই ঢুকিয়ে দেয়া হয় নারী-পুরুষ বিভেদ।

আমাদের শৈশবের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, মেয়ে শিশুদের কখনও গাড়ি বা ফুটবল জাতীয় খেলনা দেওয়া হয়নি। মেয়েদের শৈশব কেটেছে হাড়ি-পাতিল, পুতুল, বৌচি, গোল্লাছুট খেলা খেলেই।

একটু বড় হওয়ার সাথে সাথে শিশুর খেলনাও বদলে যায়।  ছেলে শিশুদের দেওয়া হয় সাইকেল জাতীয় খেলনা আর মেয়ে শিশুদের দেওয়া হয় হাড়ি-পাতিল জাতীয় খেলনা।

সাইকেল বা রিকশা জাতীয় খেলনা দিয়ে শুরুতে ছেলে শিশুরা ঘরের মধ্যেই ছুটোছুটি করে এবং পরবর্তীকালে তাদের পদচারনায় মুখর হয় মহল্লার মাঠ অথবা বাড়ির সামনের রাস্তাটি। এভাবেই ছেলে শিশুটি ঘরের বাইরে চলাফেরায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, যে মেয়ে শিশুটিকে খেলনা হিসেবে দেয়া হয়েছিল, হাড়ি-পাতিল, সে ইটের ভাঙা টুকরা আর বালি দিয়ে ভাত-তরকারি রান্নার খেলা খেলতে খেলতে এক সময় নিজের মায়ের হেঁশেলের দায়িত্বটাও তুলে নেয় নিজের কাঁধে।  আর এভাবেই, কন্যা শিশুরা অন্দরমহলে নিজের অবস্থানটাও পাকাপোক্ত করে ফেলে।

খেলনা বস্তুটিকে আমরা যত হালকা ভাবে দেখি না কেন, বিষয়টা কিন্তু ততটা হালকা নয় ।

এই খেলনাই শিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে এবং তাদের ক্যারিয়ার বা পরবর্তী জীবন পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করছে।

ছেলেদের জন্য সাইকেলের মত অ্যাকশন-ধর্মী কিছুর প্রয়োজনীয়তা পরিবার প্রথম থেকেই অনুভব করে ।

গবেষণা বলছে, মেয়ে  শিশুদের পুতুল জাতীয় খেলনা দিয়ে আমরা তার মস্তিষ্ককে বুঝিয়ে দিচ্ছি যে, তোমার কাজ ঘর-কন্না সামলানো বা সৌন্দর্য চর্চা করা। আর ছেলে শিশুদের গাড়ি জাতীয় খেলনা দিয়ে, তাকে বুঝিয়ে  দেয়া  হয় যে, বড় হয়ে তুমি গাড়ি চালাবে, প্রকৌশলী হবে বা নতুন কিছু উদ্ভাবন করবে । এই যে শিশুদের মস্তিষ্কে অল্প বয়সেই লিঙ্গ বৈষম্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তীকালে সেটাই হয়তো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

গবেষণা বলছে, যেসব শিশু নারী-পুরুষ বিভেদ বা বৈষম্য পূর্ণ পরিবেশে বড় হয়, পরবর্তীতে তারাই নারী-পুরুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে বেশি।

এ তো গেল শুধু খেলনার কথা। পোশাকও যে কতভাবে শিশুর মধ্যে নারী-পুরুষ বিভেদ তৈরি করে দিচ্ছে, আমরা হয়তো তা খেয়ালই করি না।

মনে করার চেষ্টা করুন তো, ছেলে শিশু আর মেয়ে শিশুদের পোশাক কেমন হয়! আমার বিশ্বাস, মেয়ে শিশুদের পোশাকের কথা ভাবলেই আপনার চোখে ভেসে উঠবে অনেক সুন্দর সুন্দর ফুলেল নকশার বা লেইস-ফিতা ও কুচির বাহুল্যে তৈরি কোন পোশাক। আর ছেলে শিশুদের পোশাক হয় খুব সাধারণ।

অর্থাৎ, পোশাকের মাধ্যমে একটি মেয়ে শিশুর মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে, “তুমি মেয়ে, তোমাকে সবসময় সেজে গুজে সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকতে হবে।”

পক্ষান্তরে, ছেলে শিশুদের পোশাক ফুলেল নকশা বা লেইস-ফিতা ও কুচির বাহুল্য বর্জিত হয়। কারণ পোশাকের মাধ্যমে তাকে বুঝিয়ে দেয়া ” নিজেকে সুন্দর করে রাখা তোমার কাজ নয় তোমার কাজ উদ্ভাবন করা, নির্মাণ করা, অ্যাকশনধর্মী কাজ করা”।

এমনকি শিশুদের খেলনা বা পোশাকের রং নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কিন্তু বিভাজন করা হয়। মেয়ে শিশুদের জন্য পছন্দ করা হয় পিংক বা একটু লালচে রং আর ছেলে শিশুদের জন্য পছন্দ করা হয় নীল বা নীলের কাছাকাছি কোন রং।

শিশুর মস্তিষ্ক খেলনা বা পোশাকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া এসব বার্তা গ্রহণ করে অনায়াসে। যার ফল স্বরূপ আমরা দেখতে পাই, নারীরা উদ্ভাবন, উন্নয়ন, যন্ত্র কৌশল এর চাইতে সৌন্দর্য চর্চা বা সংসারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে বেশি।

ঘরের একটি বাতি জ্বলছে না, পাশের বাড়ির ছেলেটিকে ডেকে আনছি তা সারানোর জন্য। অথচ, এসব ছোট-খাটো  বৈদ্যুতিক কাজ কিন্তু মেয়েরাও করতে পারে অনায়াসে।

অতএব, বাচ্চা কাঁদছে বলে, তার কান্না থামানোর জন্য আপনি যে খেলনাটি তার হাতে তুলে দিচ্ছেন, তা ভেবে চিন্তে দিন। আপনি চাইছেন, আপনার মেয়েটি বড় হয়ে পাইলট হবে, অথচ খেলতে দিচ্ছেন শুধু পুতুল!

আবার আপনি চাইছেন আপনার ছেলেটি শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের হোক, কিন্তু খেলার জন্য তার হাতে তুলে দিচ্ছেন রোবট অথবা ভিডিও গেম! মস্তিষ্কের সাথে শিশুর বোঝাপড়াটা যে ঠিক মত হচ্ছে না!

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *