শিশুদের নিজস্বতা

ছেলে আর মেয়েদের বড় হয়ে ওঠার মধ্যে রয়েছে পার্থক্য
May 7, 2017
চাকরি দাতা যা চান একজন চাকরি প্রার্থীর কাছে ।
May 11, 2017
Show all

শিশুদের নিজস্বতা

১-৫ বছর এ সময়টা শিশুর স্বাভাবিক ক্রমবিকাশের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। এ সময় তার নিজস্বতা, তার ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠতে শুরু করে। আদর ভালবাসার সঠিক অর্থ বুঝতে পারে। সেও যে সমাজের কেউ, সংসারে তারও একটা নির্দিষ্ট স্থান আছে এটা উপলদ্ধি করতে শুরু করে। শিশু চিৎকার করে বায়না ধরে তাকে সামলানো দায়। মাঝে মাঝে মা-বাবাকে বা পরিচর্যাকারিনীকেও লাথিঘুষি মারতে দ্বিধা করে না। এমনই ধরনের সমস্যা আজকাল বেশ দেখা যাচ্ছে।  এ সব ক্ষেত্রে বেশীরভাগই দেখা যায় শিশুর বয়স ৩-৪ বছরের মত। একটু মনযোগ শিশুকে বুঝতে চেষ্টা করলে দেখা যাবে, তার এমনই ধরনের ব্যবহারের পেছনে রয়েছে ছোট্ট কোন সমস্যা, যা সহজেই দূর করা সম্ভব।

হয়তো মা বাবা দু’জনেই বাইরে কাজ করেন। নিজেদের চাকুরি এবং একরাশ সমস্যার পরে সন্তানের জন্য তারা আর বেশি সময় দিতে পারে না। কাজ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে মা যখন রান্না ঘরে যান,অথবা বাবা একান্ত আয়েশে শরীরটা গড়িয়ে দেন বিছানায়, তখন হয়তো সে চাইছে তারা তার সাথে খেলবে। সারাদিনের জমা করে রাখা একরাশ প্রশ্ন নিয়ে সে হাজির হয় তাদের সামনে। কোন এক সময় বিরক্ত হয়ে তারা তাকে ধমক দেন। হয়তো কোন সময় দু’একটা চড়থাপ্পর দিতেও দ্বিধা করেন না। তখন শিশুর মনে বাসা বাধে দুর্দান্ত অভিমান। তার বহিঃপ্রকাশে সে হয়তো হয়ে উঠে অস্বাভাবিক দুষ্ট। এটা ভেঙ্গে, ওটা নষ্ট করে তাকে মেরে, একে ধমক দিয়ে তারা মাবাবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। অনেক সময় এ সমস্যাটা শুরু হয় অন্যভাবে। বাবা হয়তো বিদেশে থাকেন ,শিশু মায়ের কাছে থাকে। বাবার অবর্তমানে সংসার চালাতে গিয়ে মা স্বভাবতই পরিশ্রান্ত। তারপরও মাঝে মাঝে শিশুদের বিভিন্ন রোগব্যাধি ইত্যাদির কারনে উদ্বিগ্নতা বেড়ে যায় দ্বিগুন। ফলে মা মানসিক ভাবে থাকেন অত্যন্ত ক্লান্ত। এতোসব সামলিয়ে শিশুকে সময় দেয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, এবং তখনও এমনি ধরণের সমস্যার শুরু হয়।

অনেক সময় একান্নবর্তী পরিবারে হয়তো আছে একটা শিশু,অথচ তাকে আদর করার লোকের অভাব নই। খালা, মামা, ফুফু, দাদা, দাদী, নানা, নানী এমনি আরো বেশ ক’জন। খালা কলেজ থেকে ফেরার সময় চকলেট নিয়ে ফিরছেন, মামা বিকেলে চাইনিজে নিয়ে যাচ্ছেন, ফুফু হয়তো জামা কিনে দিচ্ছেন এবং এমনি করে আদরের আতিশয্যে তার ভিতর “ইগো” অর্থাৎ ‘‘আমিই একা” এমনি একটা ভাব জন্ম নেয়। সে বুঝে নেয়, বাবামাকে পরোয়া না করলে কোন ক্ষতি নেই। তাকে আদর করার অন্য লোক আছে এবং এমনি করে তার ভিতর থেকে গড়ে ওঠে এক স্বার্থপর র্শিশু।

অনেক সময় বাবা হয়তো ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। সারাদিন ব্যবসা দেখে ঘরে ফিরেন শিশুর জন্য চাইনিজ নিয়ে। অন্য কোথাও,অন্য কারো সাথে মিশে যেন নষ্ট না হয়ে যায়এ জন্য ঘরে কিনে দেন ভি.সি। আজকাল আবার তার সাথে যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার আর স্যাটেলাইট চ্যানেল। শিশুকে সারাক্ষণ হয়তো  কম্পিউটার গেইম খেলতে দেয়া হয়, অথবা সারাদিনই ‘কার্টুন’ চ্যানেলের সামনে বসিয়ে রাখা হয়। “আমার সন্তান কার্টুন চ্যানেল বন্ধই করতে দেয়না”এটা বলতেও মনে হয় আজকাল অনেক মাবাবা গর্ববোধ করেন। এর সাথে আরো রয়েছে বিজাতীয় নাচগান সমৃদ্ধ বিভিন্ন বিদেশী চ্যানেল। তাছাড়া আমাদের দেশের চ্যানেলও আজকাল বিজ্ঞাপনের নামে বিভিন্ন নাচগান দেখানো হয়। আর অধুনা মাবাবারাও শিশুকে খাওয়াবার জন্য সামনে বসিয়ে রাখেন। কিন্ত তারা বোঝেন না এতে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। চাইলেই বা কাঁদলেই পাওয়া যায়তার ভিতর এমনি একটা ধারনা জন্ম নেয়। ফলে টিভি,চ্যানেল, কম্পিউটার ছাড়া সে খায়না। এটা শিশুর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

শিশু মনস্তত্ব অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। একটা শিশুকে বুঝতে হবে, তাকে জানতে হবে।ছোট হলেও সে মানুষ। “আমার সন্তানকে মানুষের মত মানুষরূপে গড়ে তুলব বলেই পাড়ার কারো সাথে মিশতে দেই না। সারাক্ষণ সে থাকে কড়া ধমক আর নিয়ম কানুনের মাঝে। এটা ধরিস না,ওটা করিস না,এটা ভুল এমনিভাবে শিক্ষা দেই, যেন সে এখন থেকেই বুঝতে পারে, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। আর তাছাড়া আজকালকার ছেলেমেয়ে”… এটা ভুল। শিশু দুষ্টুমি করবেই।এটা তার স্বাভাবিক ধর্ম। বরং দুষ্টুমি না করাটাই অস্বাভাবিক। আর সারাক্ষণ কড়া শাসনে রাখলে শিশুর কোমল মনে একটা অপরাধবোধ জেগে উঠবে। শিশুকে তার নিজস্বতা,তার স্বকীয়তা নিয়ে বড় হতে দিতে হবে। একবার আদর, একবার সোহাগ, প্রয়োজনে ধমক বা তিরষ্কারএমনি করে তাকে বড় করে তুলতে হবে। এ পরীক্ষা অত্যন্ত কঠিন। এতে পাশ করতে অনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, বেশি আদর শিশুর জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। তাতে সব কিছু পাবার একটা গোপন বাসনা তার মনে দেখা দেয়। আর তাকে কার্যকর করতে ধীরে ধীরে সে অন্যায় করতেও পিছপা হয় না। বাবার পকেট কাটা, মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে টাকা নেয়া তার জন্য নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। পথে বেরোলেই এটা ওটার বায়না ধরা তার জন্য স্বাভাবিক,এবং তা কিনে না দেয়া পর্যন্ত মাবাবাকে কিলচড়, লাথি মারতেও সে দ্বিধাবোধ করে না। এটা নিশ্চয় ভালো না। তাই শিশুকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। একটা লতানো গাছকে আশ্রয় দিলেই চলে না, তাকে উপরে উঠার পথও দেখিয়ে দিতে হয়। শিশু লতার মত। তাকে বড় করলেই চলবে না,আদর আর অনুশাসনের মাধ্যমে তাকে মানুষরূপে গড়ে উঠবার পথ তৈরি করে দিতে হবে। আর এর উপরই সন্তানকে মানুষ করার মাবাবার সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *