বাচ্চাদের গল্পের বই পড়ানোর অভ্যাস কিভাবে করানো যেতে পারে

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা
November 19, 2017
আসুন জানি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের (www) আবিষ্কারক টিম বার্নার্স-লি সম্পর্কে
December 6, 2017
Show all

বাচ্চাদের গল্পের বই পড়ানোর অভ্যাস কিভাবে করানো যেতে পারে

 

ছোটবেলাতেই বই পড়ার অভ্যাস, অর্থাৎ স্কুলের বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য সব বই পড়ার অভ্যাসটা শিশুর মধ্যে তৈরি করে দেয়াটা খুব জরুরী। আমাদের অভিভাবকদের অনেকেরই ধারণা যে, গল্পের বই পড়ার মানে হচ্ছে স্কুলের পড়া থেকে অমনযোগী হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়া! খুবই ভুল একটা ধারণা। পুঁথিগত শিক্ষা থেকে জীবনশিক্ষাটা শৈশব থেকেই পেতে থাকাটা এক প্রকারের আশীর্বাদ। পড়াশোনা কোন প্রতিযোগিতার বিষয়ই নয়। শুধুমাত্র স্কুলের বই আপনার শিশুকে কোনদিনই বাস্তব জীবন সম্পর্কে সঠিক কোন ধারণা দিতে পারে না। আর বই বলতে শুধু গল্পের বই-ই বা হতে যাবে কেন? বই হতে পারে বিজ্ঞানের, হতে পারে ভ্রমণের, হতে পারে নিরেট আনন্দের কিংবা হতে পারে কারও জীবনী! বয়েস অনুযায়ী কোনটা বাচ্চার পড়া উচিত, তার ধারণা হয়ত আমাদের অনেকেরই নেই। সত্যি বলতে কি, বাচ্চার সামনে পড়ার মতো যা থাকবে, তা-ই গোগ্রাসে গিলে ফেলতে পারাটা এক ধরনের সফলতা।

ঠিক কিভাবে শুরু করবেন বাচ্চার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবেন তা নিয়ে একটু জানানোর চেষ্টা করছি: 

 

 

১। পারিবারিকভাবে বাড়িতে বই পড়ার একটি পরিবেশ তৈরি করাটা দরকার। নানা পদের বই দিয়ে বেডরুমে একটা সংগ্রহশালা তৈরি করুন। বসার ঘর বা সুবিধামতো জায়গায় একটা লাইব্রেরি তৈরি করে ধরন অনুযায়ী বইগুলোকে আলাদা করে লেবেল করেও রাখা যায়

২। আজকের ইন্টারনেট, স্মার্ট ফোনের যুগে শিশুর নেশা নিবদ্ধ হয়ে থাকে অজানা ও স্পর্শকাতর জিনিসের প্রতি। সেজন্যেই, শিশুর পড়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে হবে যে, দিনের অমুক সময়টিতে প্রতিদিন একটি করে বই পড়তে হবে। এ কাজে উৎসাহিত করতে বাচ্চাকে ছোটখাটো পুরস্কার বা সারপ্রাইজ দেয়ার ব্যাবস্থাও রাখা যেতে পারে।

৩। রাতে ঘুমানোর আগে শিশুকে বই দেখে পড়ে গল্প শোনাতে পারেন। এটাও একটা ভাল প্র্যাকটিস। আবার আপনি নিজে গল্প না পড়ে শিশুটিকে দিয়েও পড়াতে পারেন। এতে করে শিশুর উচ্চারণ ও জড়তা কেটে যাবে।

৪। বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করতে শিশুর পছন্দের চরিত্রকে নিয়ে লেখা বই বা কমিক কিনে দিতে পারেন। রংচঙে বই বাচ্চাদের অনেক আকর্ষণ করে।

৫। শিশুরা খুব অনুকরণ প্রিয় হয়। তাই নিজেও নিয়ম করে একটা সময় বই পড়ার জন্য রাখুন। অভ্যাসটা ধীরে ধীরে আপনার শিশুর মধ্যেও এসে যাবে নিশ্চিত করে বলা যায়।

৬। আপনার পরিবারে একাধিক শিশু-কিশোর থেকে থাকলে তাদের মধ্যে বই পড়ার প্রতিযোগিতা আয়োজন করুন। প্রতিযোগিতায় বিজয়ীকে বই দিয়েই পুরস্কৃত করুন। তাছাড়া স্কুলগুলোতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচীগুলোতে আপনার বাচ্চাদেরকে অংশ নিতে দিন। তাছাড়া যে কোন উপলক্ষতেই কিছু গিফট করতে হলে বইকে বেছে নিন।

৭। নিয়ম করে সারা বছর অনুষ্ঠিত সব ধরনের বইমেলায় সন্তানদেরকে নিয়ে যান। তাদের পছন্দে বই কিনে দিন।

৮। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত সাহিত্য নিয়ে বন্ধুসুলভ আলোচনা করতে পারেন। তার কথা মন দিয়ে শুনুন, তাকে বুঝতে দিন যে, আপনি তার ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে করে সাহিত্যের প্রতি তার উৎসাহ বাড়বে ।

শিশুকে নানা ধরনের বই কিনে দিয়ে, সেগুলো পড়ে তার কী অনুভূতি হচ্ছে সেটা আলোচনার পাশাপাশি তাকে লিখতেও উৎসাহ দিতে পারেন। এতে করে তাদের মধ্যে লেখালেখির অভ্যেসটাও তৈরি হয়ে যাবে। ছড়ার বই কিনে দিয়ে, ছড়া বা কবিতা লিখতে উৎসাহ দিতে পারেন। শিশুকে নিয়মিত বেড়াতে নিয়ে যান ও ডায়েরি লেখা অভ্যেস করান। তাকে ভ্রমণ কাহিনী লিখতেও উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এতে ভ্রমণ-সাহিত্যের প্রতি উৎসাহ বাড়তে পারে। এমনি করে যে কোন বিষয়ে শিশুর মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি করে দেয়া খুবই সহজ।

 

এবার জেনে নেওয়া যাক কোন্ ধরনের বইগুলো আসলে শিশু-কিশোরদের পড়ার উপযোগী :

১। একেবারে ছোট বাচ্চাদের বই পড়া শুরু করার জন্য দিতে পারেন ছড়ার বই।

২। সুকুমার রায়ের সমগ্র শিশুসাহিত্য হতে পারে দারুণ একটা খোরাক।

৩। এরপর বলা যায় কাজী নজরুল ইসলামের ছড়ার বইগুলোর কথা। শিশুর মধ্যে সৃজনশীলতা তৈরিতে এর বেশি আর কিছু বোধ হয় লাগে না।

৪। এরপর আছে রূপকথার বই। আমাদের দেশে রূপকথার বই হিসেবে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বেশ জনপ্রিয়।

৫। পাশাপাশি আছে ডিজনিল্যান্ডের রঙ্গিন বইগুলো। যে কোন বাচ্চার মনে বইয়ের পোকা উসকে দিতে এদের জুড়ি নেই যেন।

৬। এছাড়াও বিদেশি যেমন রাশিয়ান, চাইনিজ ইত্যাদি রূপকথার বইও দেয়া যেতে পারে। এ বয়সে বাচ্চারা রংচঙে বই খুব ভালবাসে। সেক্ষেত্রে পপ-আপ বইগুলো খুব আনন্দ দিতে পারে।

৭। তাছাড়া কমিক বই দেয়া যেতে পারে, যেমন টিনটিন, অ্যাস্টেরিক্স, চাচা চৌধুরী, হাদা-ভোদা, নন্টে-ফন্টে, বাটুল দ্য গ্রেট ইত্যাদি। ধীরে ধীরে পড়ে বুঝতে শেখার মতো ক্ষমতা যত বাড়বে, তখন থেকে আস্তে আস্তে মুক্তিযুদ্ধের বই পড়তে দিতে।

৮। মুহম্মদ জাফর ইকবালের শিশুতোষ বই, প্রবন্ধ, সায়েন্স ফিকশান চলবে, চলতেই থাকবে। সেগুলোর মধ্যে সায়েন্স ফিকশান আর ভৌতিকগুলো দারুণ মজার।

৯। এছাড়া একটা বয়েসে গিয়ে হিমু, শুভ্র বা মিসির আলিরাও বাচ্চাদের বেশ ভালই ভর করে!

১০। আইজ্যাক অ্যাজিমভের সায়েন্স ফিকশানগুলো এই বয়সে বাইবেলের মতো গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে এসবের জুড়ি নেই।

১১। পাশাপাশি অন্যান্য বিদেশি লেখকদের বই যেমন, এইচ জি ওয়েলস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মার্ক টোয়েন, জুল ভার্ন প্রমুখের বই সে অনুবাদ হোক আর মূল, পড়তে হবে।

১২। এছাড়াও দেশের ও বিদেশী নামকরা চলচ্চিত্রকারের বই ও তাদের চলচ্চিত্র ভাবনাগুলোও আপনার সন্তানের মাঝে সঞ্চারিত করতে পারেন অনায়াসেই।

১৩। সত্যজিতের ফেলুদা সিরিজ সন্তানের হাতে এই সময়ে তুলে দিতে ভুলবেন না যেন! একটা অজানা জগত খুঁজে পাবে! সত্যজিতের প্রায় সমস্ত বইতেই সেই অজানা জগতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা রয়েছে।

১৪। এরপর থাকছে সৈয়দ মুজতবা আলি কিংবা সেলিনা হোসেনের মতো বাঘা লেখকদের বইগুলো। জ্ঞানের সীমা ছাড়াতেই থাকবে তাঁদের লেখা বইগুলো। কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প তো অবশ্য পাঠ্য একটি জিনিস। দর্শন কত অদ্ভুত হতে পারে, রবিঠাকুর, নজরুল পড়া না হলে তা জানা মুশকিলই বটে। ধীরে ধীরে তাঁর উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থগুলোও দিতে হবে।

১৫। এরপর থাকে, শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, শরৎচন্দ্র, তারাশংকর, শীর্ষেন্দু, সমরেশ মজুমদার, বুদ্ধদেব গুহ, প্রমুখ। আর শৈশব থেকেই বিভিন্ন মনীষীর আত্মজীবনী পড়ে শেষ করে ফেলা অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার বয়সই তো এইসময়। রবিঠাকুর কিংবা নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত কিংবা নির্মলেন্দু দিয়েই শুরু করে দিতে পারেন সন্তানের কবিতা ও সাহিত্যে অবাধ বিচরণ।

১৬। মারিও পুজো, আগাথা ক্রিস্তি, জে কে রাউলিং, ড্যান ব্রাউনরাও আপনার সন্তানকে দিতে পারে অজানা জীবন দর্শন।

খেলার ছলে ,ছবি দেখিয়ে , গল্প বলে শিশুকে পড়ালে তারা মনোযোগী হবে, পড়তে আগ্রহী হবে । বই পড়া শিশুদের জন্য একটি ভীতির ব্যাপার । এই ভীতি থেকে কিভাবে মুক্তি দেয়া যায় সেই প্রচেষ্টা প্রথমে বাবা-মাকেই  করতে হবে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *