গ্রীক দার্শনিক প্লেটো

Last moments of O and A-level exam preparation tips
January 2, 2018
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু
January 3, 2018
Show all

গ্রীক দার্শনিক প্লেটো

গ্রীক দার্শনিক প্লেটো, আরেক বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের শিষ্য এবং অ্যারিস্টটলের গুরু, প্রাচীন গ্রীসের তো বটেই, সমগ্র বিশ্বেরই একজন অতি পরিচিত, সম্মানিত ও আলোচিত ব্যক্তি। তার চিন্তাধারা ও দর্শন কালের মহাস্রোতে হারিয়ে যায়নি। বরং কালক্রমে অধিক শক্তিশালীরূপে মানুষের মনে বসতি গড়েছে। যুগে যুগে মানুষ তার দর্শন নিয়ে ভেবেছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। বিশেষভাবে পশ্চিমাদের দর্শন ব্যাপকভাবে প্লেটোর দর্শন দ্বারা প্রভাবিত।  থার্থ তথ্যের অভাবে, প্লেটোর যথার্থ জন্ম তারিখ জানা যায় না। বিভিন্ন গবেষকদের মতে, তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৪২৮-৪২৭ অব্দের জন্মগ্রহণ করেছিলেন। গ্রিসের অন্তর্গত তৎকালীন নগররাষ্ট্র এথেন্সের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল এরিস্টন (Ariston)। গ্রিক দার্শনিকদের জীবনী লেখক ডায়োজিনিস লিরটিয়াস (Diogenes Laërtius) -এর মতে, এথেন্সের রাজা কডরাস এবং মেসেনিয়ার রাজা মেলান্থাস (Melanthus) প্লেটোর পূর্ব-পুরুষ ছিলেন।  প্লেটোর মা’র নাম পেরিক্টিওন (Perictione)। উল্লেখ্য, পেরিক্টিওনএর পূর্বপুরুষ ছিলেন বিখ্যাত এথেনীয় আইনজ্ঞ এবং গীতিকবি সোলন। প্লেটোর অপর দুই ভাইয়ের নাম ছিল এ্যাডেইমান্টুস (Adeimantus) এবং গ্লাউকোন (Glaucon)। এঁর একমাত্র বোনের নাম ছিল পোটোনে (Potone)। প্লেটের রিপাব্লিক গ্রন্থ মতে তাঁর অপর দুই ভাই প্লেটোর চেয়ে বড় ছিলেন। কিন্তু জেনোফোন-এর মতে গ্লাউকোন প্লেটোর ছোটো ছিলেন। প্লেটোর পিতা অল্প বয়সে পরলোকগমন করেন। পরে এঁর মা অন্য এক ব্যক্তিকে বিবাহ করেন। প্লেটো বড় হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর সৎভাইদের অর্থানুকুল্যে।

প্লেটোর প্রকৃত নাম ছিল এ্যারিষ্টোক্লেস (Aristocles)। আয়তাকার কাঁধের অধিকারী ছিলেন বলে, সবাই তাকে প্লেটো নামে ডাকতেন। পরে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন।

মা-বাবার কাছে প্লেটোর প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ চলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে চলে নাটক ও কাব্যচর্চা। কুড়ি বছর বয়সে প্লেটোকে শিক্ষাগ্রহণের জন্য পাঠানো হয় সক্রেটিস-এর কাছে। সেখানে এক নাগাড়ে আট বছর চলে তাঁর বিদ্যাচর্চা। আইন, নীতি শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, উদ্ভিদবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভাগেও সে হয়ে ওঠে দক্ষ। সক্রেটিস-এর মৃত্যুর পর প্লেটো তিন বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ফিলোনাস, আরকাইটাস ও ইউরাইটাস-এর কাছে দীর্ঘদিন দর্শনের পাঠ নেন। সক্রেটিস-এর মত প্লেটোও গ্রীকরাজ্যে আইনের ব্যাপক প্রবর্তন চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় ।

তরুণ প্লেটো অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে উঠলেন সক্রেটিসের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য। গুরুর বিপদের মুহূর্তেও প্লেটো ছিলেন তার নিত্যসঙ্গী। প্লেটো শুধুই যে সক্রেটিসের প্রিয় শিষ্য ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন গুরুর জ্ঞানের ধারক-বাহক।
গুরুর প্রতি এতো গভীর শ্রদ্ধা খুব কম শিষ্যের মধ্যেই দেখা যায়। প্লেটো যা কিছু লিখেছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার প্রধান নায়ক সক্রেটিস। এর ফলে উত্তরকালের মানুষদের কাছে একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সক্রেটিসকে কেন্দ্র করে প্লেটো তার সব সংলাপ তত্ত্বকথা প্রকাশ করেছেন। সব সময়েই প্লেটো নিজেকে আড়ালে রেখেছেন- কখনোই প্রকাশ করেননি। সক্রেটিসের জীবনের অন্তিম পর্যায়ের যে অসাধারণ বর্ণনা করেছেন প্লেটো তার ‘সক্রেটিসের জীবনের শেষ দিন’ গ্রন্থে, জাগতে তার কোনো তুলনা নেই ।

সক্রেটিসের মৃত্যুর পর প্লেটো ক্ষুব্ধচিত্তে এথেন্স ত্যাগ করেন ২৮ বৎসর বয়সে। এথেন্স থেকে প্রথম তিনি মেগরাতে যান। সেখানে তাঁর শিষ্য এবং বন্ধু ইউক্লিড একটি দর্শন-সম্প্রদায় তৈরি করেছিলেন। এরপর তিনি প্রায় ১২ বৎসর ইটালি, সিসিলি, মিশর, সাইরিন ইত্যাদি এলাকা ঘুরে বেড়ান।

৪০ বৎসর বয়সে তিনি আবার এথেন্সে ফিরে আসেন। এরপর এথেন্সের বাইরে একটি নির্জন স্থানে তিনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানটির নাম দেন এ্যাকাডেমি। উল্লেখ্য গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র একেডেমাস-এর নামানুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছিলেন এ্যাকাডেমি।  প্লেটোর এই এ্যাকাডেমিকে— আধুনিক ইউরোপীয় বিদ্যালয়ের প্রাথমিক রূপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই বিদ্যালয়ে দর্শন ছাড়াও বিজ্ঞান, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো।

আসলে প্লেটোর আগে দর্শন শাস্ত্রের কোন রকম গঠন বা শৃঙ্খলা ছিলোনা, তিনিই প্রথম দর্শন শাস্ত্রের ভিত রচনা করেন । দার্শনিক প্লেটোর আরেক দিক তার কবিসত্তা। দর্শনের ভাষা যে এমন প্রাণবন্ত, কাব্য সৌন্দর্যে অতুলনীয় হয়ে উঠতে পারে, প্লেটোর রচনা না পড়লে তা অনুভব করা যায় না। প্লেটো ছিলেন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ।

একটি বিয়ের দাওয়াত এ যাওয়ার পরে তিনি অসুস্থ হয়ে যান এবং নিরবেই মৃত্যুবরণ করেন । কিন্তু তিনি তার লেখা ও আদর্শ দিয়ে অমর হয়ে রয়েছেন ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *