পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু
January 3, 2018
লেওনার্দো দা ভিঞ্চি
January 8, 2018
Show all

লুই পাস্তুর

প্যারিসের একটি চার্চে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। কন্যাপক্ষের সকলে কনেকে নিয়ে আগেই উপস্থিত হয়েছে। পাত্রপক্ষের অনেকেই উপস্থিত। শুধু বর এখনো এসে পৌঁছাননি। সকলেই অধীর অপেক্ষায় আছে বরের দেখা নেই। কনের বাবা পাত্রের এক বন্ধুকে ডেকে বললেন, কী ব্যাপার, এখনো তো তোমার বন্ধু এল না? পথে কোনো বিপদ হলো না তো? বন্ধু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল। দু-চার জায়গায় খোঁজ করল কিন্তু কোথাও বরের দেখা নেই। হঠাৎ মনে হলো একবার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খোঁজ করলে হতো। ল্যাবরেটরিতে গিয়ে হাজির হলো বন্ধু। যা অনুমান করেছিল তাই সত্যি। টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে আপন মনে কাজ করে চলেছে বর। চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই তার দৃষ্টি নেই। এমনকি বন্ধুর পায়ের শব্দেও তার তন্ময়তা ভাঙে না। আর সহ্য করতে পারে না বন্ধু, রাগে চেঁচিয়ে ওঠে, আজ তোর বিয়ে, সবাই চার্চে অপেক্ষা করছে আর তুই এখানে কাজ করছিস।

মানুষটা বন্ধুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, বিয়ের কথা আমার মনে আছে কিন্তু কাজটা শেষ না করে কী করে বিয়ের আসরে যাই!

গবেষণায় উৎসর্গীকৃত এই মানুষটির নাম লুই পাস্তুর। লুই পাস্তুরের জন্ম ১৮২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর। বিভিন্ন রোগের কারণ ও তার প্রতিকার নিয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। প্রাচীনকালে অনেক সময় এমন হত, খাদ্য এবং তরল (যেমন দুধ) খাওয়ার পর মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ত। লুই পাস্তুর এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তিনি গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারেন যে খাবার থেকে অসুস্থ হওয়ার কারণ হচ্ছে তরল খাদ্যে থেকে জীবাণু। তিনি জীবাণুদের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। পদ্ধতিটিকে বলা হয় পাস্তুরাইজেশন। এ পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট পরিবেশে তরলের রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কোনো ক্ষতি ছাড়া এই তরলগুলোকে সংরক্ষণ করা যায় আবার রোগের হাত থেকে মুক্তিও মেলে।

ছোট বেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী । ছাত্রের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, লুই পাস্তুর একজন কৃতী শিক্ষক হবে, তার সে ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়নি। মাত্র বিশ বছর বয়সেই তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক করেন। রসায়ন ছিল সবথেকে প্রিয় তার, আর তাই রসায়নে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে স্ট্রাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক পদ লাভ করেন । রসায়নশাস্ত্রে লুই পাস্তুরের রয়েছে কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার। তিনি যখন ইউনিভার্সিটি অব স্ট্রাসবার্গ এর অধ্যাপক ছিলেন তখন, টারটারিক এসিডের ধর্ম আর বিভিন্ন ক্রিস্টালের আণবিক গঠন আবিষ্কার করেছেন।

তিনি দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিষেধক সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। চিকেন কলেরা যেটি মূলত মুরগী এবং অন্য পাখির শরীরের কলেরা রোগ তিনি সেই কলেরার প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। এর ফলে পোল্ট্রি শিল্পে অনেক উন্নতি সাধন হয়। এছাড়াও তিনি র‍্যাবিস রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৮৮৫ সালে সর্বপ্রথম একটি বালকের দেহে এই প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে বালকটির জীবন রক্ষা পায়।

লিলে অঞ্চলে ছিল মদ তৈরির অসংখ্য কারখানা। দীর্ঘদিন উত্পাদিত মদ ভালো রাখতে না পারায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলো মালিক এবং সরকার। পাস্তুর গবেষণা করে বের করলেন কী কারণে মদ নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের জন্য তিনি আবার গবেষণা করতে থাকেন। গবেষণায় সফল হলেন। তাঁর আবিষ্কৃত তথ্য আজ পৃথিবী জুড়ে ‘ পাস্তুরাইজেশন’ নামে পরিচিত। এভাবে তিনি আবিষ্কার করেছেন— গুটি পোকার দুটি প্রধান রোগ এবং রোগ নির্মূলের উপায়। ১৮৩৭ সালে তাঁকে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয়। এখানে তিনি জীবাণু তত্ত্ব সম্বন্ধে গবেষণা শুরু করেন। আবিষ্কার করেন এনথ্রাক্স রোগের কারণ এবং এনথ্রাক্সের প্রতিষেধক। সে সময় জলাতঙ্ক রোগের ব্যাপক প্রকোপ ছিলো। বিশেষ করে পাগলা কুকুর কামড়ালে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়। লুই পাস্তুর কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দ্বারা আবিষ্কার করেন জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক। এই আবিষ্কার তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে।

পাস্তুরের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্স তাকে Legion of Honor–এর Grand Croix নামক সম্মাননায় ভূষিত করে। তিনি ১৮৯৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *