একুশে বইমেলার ইতিহাস

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সাফল্যের গল্প
February 8, 2018
বিষণ্ণতার বিভিন্ন দিক ও কাটিয়ে উঠার উপায়
February 15, 2018
Show all

একুশে বইমেলার ইতিহাস

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস, বইমেলার মাস। অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলে এসেছে দুয়ারে। লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের মন বই বই গন্ধে মাতোয়ারা। বাংলা ভাষার সর্ববৃহৎ এই বই মেলাটি আমাদের সংস্কৃতির একটি অনবদ্য অংশ।
মানব সভ্যতা বিকাশের প্রারম্ভকাল থেকে বই মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদে বইকে আঁকড়ে ধরেছে আপ্রাণ। লিপি আবিস্কারের পর থেকে মানুষ মনের কথা লিখতে শুরু করে। গাছের ছাল-বাকল, পাতা, পাহাড় গাত্রে অথবা পাথরে মানুষ লিখে রাখত কথামালা। পরবর্তী সময়ে মানুষ আবিস্কার করে কাগজ। তবে বইয়ের জগতের ধারণা পাল্টে যায় মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পর। খ্রিষ্টীয় পনেরো শতকে জার্মানির ইয়োহানেস গুটেনবার্গ আবিস্কার করলেন ছাপাখানা। এরপরই পাল্টে যায় বইয়ের জগতের চিত্র। মুদ্রণ যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে বইয়ের প্রচার ও প্রসারও বাড়তে থাকে।


১৭৭৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানার বিস্তার ঘটে। পর্তুগিজ নাগরিক ন্যাথালিয়েন ব্রাসিহ্যালহেড এ দেশে বসবাসকারী অভারতীয়দের বাংলা শেখার জন্য একটি বই লেখেন। পর্তুগিজ ও বাংলা ভাষার মিলিত ব্যাকরণ বই। সে বইয়ের বাংলা উদাহরণ দেওয়ার জন্যই প্রথম বাংলা হরফ ছাপা হয়। এরপর বাংলাদেশেও মুদ্রণশিল্প বিকাশ লাভ করে। সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠতে থাকে ছাপাখানা। প্রকাশিত হতে থাকে বই, পত্রপত্রিকা। এর পাশাপাশি বড় হতে থাকে বইয়ের বাজার। এ সময়েই পড়ালেখা জানা মানুষদের উদ্যোগে গড়ে উঠতে থাকে বাংলা ছাপানো বইয়ের হাটবাজার। আজকের বইমেলা সেই ইতিহাসেরই অংশ। ধারণা করা হয়, বিশ্বের প্রথম বইমেলা শুরু হয় জার্মানিতে। কারও কারও মতে, জার্মানির লিপজিগ শহরে হয়েছিল প্রথম বইমেলা। খ্রিষ্টীয় সতেরো শতকের পর থেকে ইউরোপের আরও বিভিন্ন দেশ জার্মানির বইমেলার আদলে আয়োজন করতে থাকে মেলার।

বইমেলার ইতিহাস

বাংলাদেশে বইমেলার ইতিহাস খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। স্ব্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ঘটনা। সেই বছর ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে এক টুকরো চটের ওপর ৩২টি বই নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে এক বইমেলার সূচনা করেন। এই ৩২টি বই চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তার একার দায়িত্বে এবং উৎসাহে বইমেলা চলতে থাকে। ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে বাড়তে থাকে এই মেলার গ্রহণযোগ্যতা। চিত্তরঞ্জন সাহার এই আগ্রহ এবং মানুষের ভালোবাসার কারণে ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি এই উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ১৯৭৯ সালে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। এ সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৪ সালে এসে গ্রন্থমেলার জন্য বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রণীত হয় এবং এই গ্রন্থমেলার নাম হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। সেই থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রতি বছর প্রায় একই আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।


আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮০ সালের গ্রন্থমেলায় যে সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০; মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৮৫ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২তে। ১৯৯১ সালে এ সংখ্যাটি ১৯০-এ উন্নীত হয়। এর মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭০। সত্তর দশকের শেষ দিকে মেলার ব্যাপক আয়োজন শুরু হলেও এ আয়োজন পূর্ণতা পায় আশির দশকের মাঝামাঝি এসে। নব্বইয়ের শুরুতে মেলা অভাবনীয় ব্যাপ্তি লাভ করে।  ও পাঠকের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূল আয়োজন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
উদ্যানের বিশাল প্রাঙ্গণে মেলা স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে মেলার আবেদন বেড়ে গেছে অনেকটাই।  প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন চলছে পুরোদমে। মেলার স্টল বরাদ্দ, স্টল তৈরি এবং মেলা চলাকালীন সেমিনার অনুষ্ঠানের স্থান তৈরিতে ব্যস্ত বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় সেখানকার সাজসাজ অবস্থা।

সৃজনশীল-মননশীল এবং পাঠ্যপুস্তকের জন্য দেশের সর্ববৃহৎ বইয়ের বাজার অবস্থিত পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায়। পঞ্চাশ দশকের শুরুতে বাংলাবাজারে বইয়ের বাজার যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ৭০ বছরের পুরনো বাংলাবাজারের এ বইয়ের বাজার। বইমেলাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে বাংলাবাজারেও বছরের অন্য সময়ের চেয়ে ব্যস্ততার মাত্রা বেশি। মেলায় প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় নতুন বইয়ের ছাপা, বাঁধাই এবং কাটিংয়ের কাজ চলছে পুরোদমে। সমগ্র বাংলাবাজার এলাকা নতুন বইয়ের গন্ধে মাতাল। প্রকাশক, লেখক এবং সংশ্নিষ্ট সবাই ব্যস্ত বইয়ের কাজে।

এ বছর মোট ৬৬২টি স্টল বরাদ্দ দিয়েছে বাংলা একাডেমি। গত মেলার চেয়ে এবার স্টলের ইউনিট বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩৩টি। চার ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়েছে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে। ৩ ইউনিটের স্টল দেওয়া হয়েছে ৩৪ প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠান শিশু-কিশোর বই প্রকাশনা সংস্থা। নতুন ৩০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে স্টল দেওয়া হয়েছে। বেড়েছে ১২টি প্যাভিলিয়ন। গতবার প্যাভিলিয়ন ছিল ১১টি। এ বছর মোট ২৩টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও অন্যবারের মতো একাডেমির বহেড়াতলায় থাকছে লিটলম্যাগ স্টল।

এ বছরও অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণকে ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত ও শফিউরের নামে ভাগ করা হয়েছে। এছাড়া নজরুল মঞ্চের সামনে শিশুকর্ণারে থাকবে শিশু-কিশোর বিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারেও নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নজরুল মঞ্চে থাকবে। গ্রন্থমেলার প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র থাকবে বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে। সাংবাদিকদের মিডিয়া সেন্টার থাকবে তথ্যকেন্দ্রের উত্তর পার্শ্বে। তাত্ক্ষণিকভাবে মেলা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের জন্য ফ্যাক্সসহ ই-মেইল সুবিধা থাকবে মিডিয়া সেন্টারে। ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণকে ওয়াই-ফাই জোনে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে মেলায় নিয়ে আসা ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইলে ব্যবহারকারীরা ফ্রি ব্রাউজিংয়ের সুবিধা পাবেন।

বর্তমান সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্তৃপক্ষ গ্রন্থমেলায় তাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এবার নজরুল মঞ্চে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, তথ্যকেন্দ্রের সর্বশেষ খবর এবং মেলার মূল মঞ্চের সেমিনার প্রচারের ব্যবস্থা করবে। মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ থেকে চ্যানেল আই, মাছরাঙা টেলিভিশন, বাংলা ভিশন, গাজী টিভি, সময় টেলিভিশন, চ্যানেল একাত্তর, এস এ টিভি মেলার তথ্যাদি প্রতিদিন সরাসরি সম্প্রচার করবে। গ্রন্থমেলার সংবাদ নিয়ে ‘বইমেলা প্রতিদিন’ নামে প্রতিদিন বুলেটিন প্রকাশিত হবে।
বইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা দিন দিন বাড়ছে। চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগ এবং ভালোবাসায় যে বইমেলার গোড়াপত্তন, তা শুধু একটি বইমেলাই নয়, বরং অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাঙালির সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বইমেলা শুধু বই প্রকাশ, প্রদর্শন এবং বিক্রির মেলাই নয় বরং লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে উঠেছে। এই উৎসবের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে যাক, সমানভাবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *